Home •বাংলাদেশ বাংলাদেশে আসন্ন রাজনৈতিক ভূমিকম্প এবং স্বৈরাচার নির্মূলে নয়া আশাবাদ
বাংলাদেশে আসন্ন রাজনৈতিক ভূমিকম্প এবং স্বৈরাচার নির্মূলে নয়া আশাবাদ PDF Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Sunday, 23 September 2018 08:02

নির্মূলের আতংক স্বৈর মহলে

স্বৈরশাসকগণ নিজেদেরকে যতই শক্তিশালী ভাবুক না কেন, সেটি বাইরের খোলস। মনের গভীরে তারা অতি দুর্বল তাদের প্রতিটি মুহুর্ত কাটে নির্মূলের ভয়ে। নিরস্ত্র জনগণের ধাক্কায় তাদের গদি সহজেই উল্টে পড়ে। নিরস্ত্র কিশোর-বিদ্রোহেও তারা যে কতটা শিউরে উঠে -সেটি তো সম্প্রতি ঢাকার রাস্তায় দেখা গেল। সে দুর্বলতার আরো প্রমাণ মেলে সশস্ত্র সেনাবাহিনী, পুলিশ বাহিনী ও দলীয় গুণ্ডাবাহিনীর উপর সদা নির্ভরতা। অপর দিকে সরকার বৈধতা পায় এবং জনগণের মাঝে শক্ত ভিত্তি পায় জনপ্রিয়তার শিকড় থাকাতে সে শিকড়টি মজবুত হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের রায়ের ভিত্তিতে ক্ষমতায় আসাতে এরূপ গণতান্ত্রিক সরকারগুলো হলো জনগণের নিজস্ব সরকার; সে সরকারগুলিকে পাহারা দেয় খোদ জনগণ। এমন একটি নির্বাচিত সরকারকে হঠাতে যখনই কোন অশুভ শক্তি আঘাত হানে, তারা শুধু সরকারের নয়, জনগণেরও শত্রু রূপে গণ্য হয় কারণ সেরূপ হামলায় মারা পড়ে জনগণের নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার। গণতান্ত্রিক সরকারের উপর সন্ত্রাসী হামলা তাই সভ্য সমাজে বৈধতা পায় না। সমর্থণও পায় না। তাই তুরস্কের নির্বাচিত সরকারের উৎখাতে যখন সামরিক ক্যুর চেষ্টা হয় তখন জনগণের অধিকারের উপর সে ডাকাতি রুখতে হাজার হাজার জনগণ রাস্তায় নেমে আসে অনেকে কামানের গোলায় এবং টাংকের নীচে শুয়ে প্রাণও দিয়েছে। প্রতিবাদি জনগণ ক্ষমতা ছিনতাইয়ের সে অপচেষ্ঠা এভাবেই ব্যর্থ করে দেয়।

 

 

গণতন্ত্র লাশ হয় এবং জনগণের ঘাড়ে অবৈধ সরকার চেপে বসে মূলতঃ দুই ভাবে। এক). সামরিক অভ্যুত্থানে; দুই). ভোটারহীন নির্বাচনে। বস্তুতঃ দুটি পদ্ধতিই হলো, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস। বাংলাদেশে জনগণের অধিকার ছিনতাই হয়েছে উপরুক্ত দুই ভাবেই। পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর গণতন্ত্রকে প্রথমে কবরে পাঠান খোদ শেখ মুজিব। সেটি হয় সকল বিরোধী দল নিষিদ্ধ করে এবং  একদলীয় বাকশালী শাসন প্রক্রিয়া চালু করে তিনি নিষিদ্ধ করেন সকল বেসরকারি ও বিরোধীদলীয় পত্রিকা। এভাবে কেড়ে নেয়া হয় জনগণের স্বাধীন ভাবে দলগড়া, কথা বলা ও পত্রিকা প্রকাশ করার সকল গণতান্ত্রিক অধিকার। পাকিস্তান আমলে গণতন্ত্রের পক্ষে বড় বড় কথা বল্লেও নিজেকে শেখ মুজিব প্রতিষ্ঠিত করেন একজন ক্ষমতালিপ্সু স্বৈরাচারি শাসক রূপে। এটি ছিল তার ঘোষিত ওয়াদার সাথে অতি কলংকজনক ডিগবাজি। যে কোন সভ্য সমাজেই এটি অতি নিন্দিনী বিষয়। কিন্তু ডাকাত দলে ডাকাত সর্দারের নৃশংস নিষ্ঠুরতা কখনোই নিন্দিত হয় না; বরং সেটি প্রশংসিত হয়। তেমনি বর্বর স্বৈরাচারও প্রশংসিত হয় ফ্যাসিবাদী দলে। ফলে শেখ মুজিব আওয়ামী বাকশালীদের কাছে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী। বাংলাদেশে দ্বিতীয়বার গণতন্ত্রকে কবরে পাঠানোর কাজটি করেন জেনারেল এরশাদ। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এ ছিল আরেক ডাকাতি। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুর সাত্তারকে হঠিয়ে এ দুর্বৃত্ত জেনারেল দেশের শাসন ক্ষমতা নিজ হাতে নেন তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসেন আরেক সামরিক সন্ত্রাসী জেনারেল মঈন। এ সামরিক স্বৈরশাসক দরজা খুলে দেন সিভিল স্বৈরাচারের। এবং শুরু শেখ হাসিনার নৃশংস স্বৈরশাসন। বিগত ৫ বছর তিনি ক্ষমতায় আছেন জনগণের রায় না নিয়েই। যে কোন সভ্যদেশেই এটি শাস্তিযোগ্য ফৌজাদারি অপরাধ। অথচ বাংলাদেশে চলছে সে অপরাধীদেরই দুঃশাসন।


২০১৪ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার সরকার শতকরা ৫ ভাগ ভোটারকেও ভোটকেন্দ্রে হাজির করতে পারেনি। ভোট যখন মূল্য হারায়, ভোটারগণও তখন আগ্রহ হারায় ভোট দেয়ায়। অথচ ভোট গুরুত্ব পেলে বৃদ্ধ নারী পুরুষ নানারূপ অসুস্থ্যতা সত্ত্বেও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ভোট কেন্দ্রে আসে এবং লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেয়। অথচ ভোটের সে মূল্য ভোট ডাকাতির নির্বাচনে থাকে না। কে নির্বাচিত হবে -সে বিষয়টি ভোটাদের হাত থেকে ছিনিয়ে সরকার নিজ হাতে নিয়ে নেয়। নির্বাচন তখন প্রহসনে পরিণত হয়। ডাকাত যেমন গৃহস্থের অর্থ নিজ পকেটে পুরে, সন্ত্রাসী সরকারও তেমনি জনগণের ভোট ইচ্ছামত হাতিয়ে নেয়। এজন্যই এমন নির্বাচনকে বলা হয় ভোট ডাকাতির নির্বাচন ২০১৪ সালে নির্বাচন এতটাই গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে যে, সরকার সংসদের ১৫৩ সিটে কোনরূপ ভোটকেন্দ্রই খোলেনি। নিজ ঘরে ডাকাতি করেছে এমন চোর-ডাকাতদের সাথে কেউই বন্ধুত্ব করে না; বরং সুযোগ খোঁঝে তাকে শাস্তি দেয়ার। চোর-ডাকাতগণও সেটি বুঝে। এজন্যই যে গৃহে ডাকাতি করে সে গৃহের মালিকের সামনে তারা যায় না। এরূপ অপরাধীগণ সাধারণতঃ নিশাচর হয়। একই অবস্থা স্বৈরশাসকদেরও। চোর-ডাকাতদের ন্যায় তাদের মনেও যে ভয়টি প্রতি মুহুর্তে বিরাজ করে -সেটি হলো গণপিটুনিতে মারা পড়ার । সেটি কল্পিত ভয় নয়, নিরেট বাস্তবতাও। চোর-ডাকাতদের ন্যায় বহু স্বৈরশাসকও যে জনগণের চপথাপ্পড়ে মারা পড়ে সেটি তো ইতিহাসের নতুন বিষয় নয়। রাশিয়ার সর্বশেষ জার দ্বিতীয় নিকোলাস, লিবিয়ার মোয়াম্মার গাদ্দাফি, আফগানিস্তানের নজিবুল্লাহ  এবং রোমানিয়ার চশেস্কুর ন্যায় বহু স্বৈরশাসক তো এভাবেই মারা পড়েছে। অথচ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে পরবর্তী নির্বাচনে গদি গেলেও গণপিটুনিতে প্রাণ যায়না। বরং আরেক নির্বাচনে আবার নির্বাচনের সম্ভাবনাও থাকে। শান্তিপূর্ণ ভাবে যেমন গদিতে উঠতে পারে, তেমনি নামতেও পারেন। কিন্তু স্বৈরশাসকের ক্ষেত্রে ক্ষমতা থেকে নামাটি আদৌ নিরাপদ হয় না। কারণ, নামার সিঁড়িটি তারা নিজেরাই ধ্বংস করে দেয়। ক্ষমতা থেকে তাদেরও যে নামতে হতে পারে সে সামান্য বোধটুকুও তাদের থাকে না। অবৈধ শাসকদের জীবনে এজন্যই আসে মহা বিপদ। সে বিপদের রূপটি নিজ চোখে দেখে গেছেন শেখ মুজিব। সে ভয়ে শেখ হাসিনা এতটাই আতংকগ্রস্ত যে রাস্তায় নিরস্ত্র কিশোরদের আওয়াজেও তিনি আঁতকে উঠেন। সম্প্রতি স্কুলের কিশোর-কিশোরীদের মিছিল থামাতে হাজার হাজার পুলিশের পাশে সশস্ত্র দলীয় গুণ্ডাদের নামানোর কারণ তো সে ভয়।

 

নির্বাচিত না হওয়ায় জনগণের স্তরে স্বৈরশাসকদের শিকড় থাকে না। নিপাতগ্রস্ততার ভয়ে চারিদিকে তারা শুধু শত্রুই দেখতে পায় ভয়ের কারণে নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে তারা দেশের কারাগারগুলি পূর্ণ করে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষ দিয়ে। যে বিমানে বা ট্রেনে সাধারণ জনগণ চড়ে, প্রাণভয়ে সেখানে তারা উঠে না। তারা রাস্তায় নামে পুলিশ দিয়ে রাস্তা খালি করে। এটি সত্য, স্বৈরশাসকদের নির্বাচনে হারানো যায় না হারানো যায় না অস্ত্রবলেও। কিন্তু তারপরও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যতটা স্থিতিশীলতা থাকে, স্বৈরাশাসনে সেটি থাকে না। প্রচুর পুলিশ-প্রহরা সত্ত্বেও তারা ধরাশায়ী হয় গণঅভ্যুত্থানে কারণ পুলিশ ও সেনাবাহিনী দিয়ে আর যাই হোক গণঅভ্যুত্থান থামানো যায় না।  বিপুল অর্থ ব্যয়ে চাকর-বাকরের গোলামী কিছু দিনের জন্য কেনা সম্ভব হলেও বেশী দিনের জন্য কেনা যায় না। ফলে রাশিয়ার জার, ইরানের শাহ, ফিলিপাইনসের মার্কোস, মিশরের হোসনী মুবারক, তিউনিসার বিন আলী এবং বাংলাদেশের জেনারেল এরশাদের ন্যায় অসংখ্য স্বৈরশাসকের নিপাত ঘটেছে নিরস্ত্র মানুষের গণঅভ্যুত্থানে, ভোটে নয়

 

 

শেখ হাসিনার অধীনে অসম্ভব কেন নিরপেক্ষ নির্বাচন?

ভাল কাজের সামর্থ্য থাকলেই চলে না। সে জন্য নিয়েতও অতি জরুরী। মহান অআল্লাহতায়ার দরবারে আমল কবুল হয় নিয়েত অনুসারেতাই এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চোর-ডাকাত ধনী হতে পারে কিন্তু তাদের দ্বারা মানুষের ক্ষতি ছাড়া ভাল কাজ হয়না। বিষয়টি তেমনি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও। নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থাপনা কোন হাইটেক রকেট সায়েন্স নয়। এমন কি নেপালের মত অনুন্নত দেশেও সুষ্ঠ ও নিরেপক্ষ নির্বাচন হয়। দেশের সকল দলের কাছেই শুধু নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গণেও তা গ্রহণযোগ্য হয়। এমন কি বাংলাদেশের মাটিতে আজ থেকে ৬৪ বছর আগে সর্বজন সমাদৃত একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছিল। সেটি সম্ভব হয়েছিল এ কারণে যে, পূর্ববাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মুসলিম লীগের জনাব নূরুল আমিন ভোট-ডাকাত ছিলেন না। বাকশালীও ছিলেন না। তিনি ছিল গণতন্ত্রি। যোগাযোগ ব্যবস্থা ও টেকনিকাল সামর্থ্যের দিক দিয়ে আজকের চেয়ে সে আমলের প্রশাসন দুর্বল হলেও সরকার প্রধানের সৎ নিয়েত ছিল। ফলে সম্ভব হয়েছিল নিরপেক্ষ নির্বাচন। জনাব নূরুল আমিন হেরে গিয়ে প্রমাণ করেছিলেন, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে তার সৎ নিয়েত ছিল।

 

কিন্তু শেখ হাসিনাকে নিয়ে সমস্যাটি হলো, তাঁর নিয়েত ভোট ডাকাতির, নিরপেক্ষ নির্বাচন নয়। তিনি প্রশাসনের কর্মচারিদের ব্যবহার করতে চান তার পক্ষে ভোট ডাকাত রূপে। ফলে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব -এটি যারা বলে বেড়ায় তারা হয় হাসিনার দলীয় ভাঁড় অথবা মস্তিষ্ক বিকৃত আবাল। শেখ হাসিনার কুৎসিত মন-মানসিকতার সাথে যাদের সামান্যতম পরিচিতি আছে -এমন সুস্থ্য মানুষ সেটি কল্পনাও করতে পারে না। কারণ, কল্পনার জন্যও তো বিশেষ প্রেক্ষাপট লাগে। হাসিনার এজেন্ডা তো তাঁর পিতার ন্যায় বিরোধীদলমুক্ত বাকশালী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠামুজিবের আদর্শ কখনোই বহুদলীয় গণতন্ত্র ছিল না, সেটি ছিল সকল বিরোধী দল ও সকল বিরোধী মতের নির্মূল। হাসিনার গর্ব শেখ মুজিবের আদর্শ নিয়ে। ফলে বিরোধী দল ও বিরোধী মতের নির্মূল না হলে শেখ মুজিবের আদর্শের প্রতিষ্ঠা হয় কি করে? লক্ষ্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান তিনি বিলুপ্ত করবেন কেন? বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের খুন বা গুমই বা করবে কেন? মাঠে-ময়দানে মিছিল-মিটিংই বা নিষিদ্ধ করবেন কেন? ভোট-ডাকাতি কি শুধু ভোট কেন্দ্রে হয়? ডাকাতির কাজে শুরু তো জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ছিনতাই করার মধ্য দিয়ে। এবং সেটি লাগাতর চলছে বিগত হাসিনার ১০ বছরের শাসনকাল ধরে।

 

হাসিনার অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়ার অর্থই হলো, তাকে বিজয়ী করার ভোট ডাকাতিতে শরীক হওয়া এবং তাঁর অবৈধ নির্বাচনকে বৈধতা দেয়া। দেশবাসীর বিরু্দ্ধে সেটি তো অমার্জনীয় গাদ্দারি। সে অপরাধ থেকে বাঁচতেই ২০১৪ সালের ভোট ডাকাতির নির্বাচনে কোন সভ্য ব্যক্তি অংশ নেয়নি। শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী রেখে ৩০০ সিটের সংসদের মাঝে ১৪৯ সিট পেলেও কি কোন লাভ হবে? তাতেও কি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাবে? স্বৈরশাসককে ক্ষমতায় রেখে তার নীতিতে পরিবর্তন দূরে থাক, তার গায়ের একটি পশমও খসানো যায় নাএরশাদের অধীনে তাই সংসদে গিয়ে লাভ হয়নি। তাকে গদি থেকে নামাতে হয়েছে। অনেকে ভাবছেন, নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদে বসে অন্ততঃ প্রতিবাদের আওয়াজ তুলে হৈচৈ করা যাবে। এটি শিশু সুলভ কল্প বিলাস। যারা রাস্তায় কিশোরদের শান্তিপূর্ণ মিছিল করতে দেয় না, তারা সংসদে হৈচৈ বা আওয়াজ করতে দিবে? সড়কের হৈচৈ তো সড়কেই হারিয়ে যায়। কিন্তু সংসদের হৈচৈ তো দেশময় ছড়িয়ে যায়। স্বৈর শাসক কি সেটি সহ্য করে?

 

স্বৈরশাসকের কাছে অতি অসহ্য হলো কারো মুখ থেকে তার বিরুদ্ধে সমালোচনা সেটি যেমন রাজপথে তেমনি সংসদে বা মিডিয়াতে। যারা হাসিনার অধীনে সংসদে বসে আওয়াজ তোলাকে গণতন্ত্র বলে -তারা নিশ্চয়ই পরিচিত নয় হাসিনার নৃশংস মানসিকতার সাথে। সংসদে বেশী হৈচৈ করলে হাসিনার চাকর-বাকরদের হাতে জুতাপেটা বা লাঠিপেতা হয়ে সংসদের ভিতরে বা বাইরে মারা পড়তে হবে। সে কাজে আওয়ামী লীগের হাত কতটা পাকা সে প্রদর্শনী তারা অতীতে করেছে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনি বিজয়ের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিক পরিষদে শেরে বাংলা ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন কৃষক-শ্রমিক-প্রজা পার্টির সদস্য সংখ্যা আওয়ামী লীগের চেয়ে অধীক ছিল। তখন শেরে বাংলা ফজলুল হক নিজে ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দল থেকেই ডিপুটি স্পীকার ছিলেন জনাব শাহেদ আলী। কিন্তু তারপরও আওয়ামী লীগের সদস্যদের গুণ্ডামী থেকে জনাব শাহেদ আলী প্রাঁণে বাঁচেননি। সংসদের মধ্যেই তাঁকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয় এবং পরে হাসপাতালে নেয়ার পর তিনি নিহত হন। সে খুনের বিচারও খুনিরা হতে দেয়নি। এখন তো সে খুনের রাজনীতি আওয়ামী দলীয় কালচার হয়ে গেছে। বিরোধী দলের নেতাদের বিরুদ্ধে যে গুম ও খুনের নৃশংসতা এখন সংসদের বাইরে চলছে, সেটি তখন সংসদের ভিতরে হবে। ফলে শাপলা চত্ত্বর সৃষ্টি হবে সংসদের অভ্যন্তরে।

 

বিরোধী দল ও বিরোধী মতের নির্মূলের কাজে হাসিনার চাকর-বাকর কি শুধু তাঁর দলীয় ক্যাডারগণ। ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার কারণে চাকর-বাকরে পরিণত হয়েছে তো সেনাবাহিনীর সদস্যগণও। সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বিলুপ্ত হয়েছে দেশের স্বাধীন বিচার ব্যবস্থাও। এ সন্ত্রাসীরা গৃহবন্দী করেছে এমনকি দেশের প্রধান বিচারপতিকে। এভাবে বাংলাদেশের কলংকিত ইতিহাসে যোগ করলো আরেক নতুন কলংক। সম্প্রতি হাসিনার চাকর-বাকরদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিবরণ দিয়েছেন রাস্তার কোন সাধারণ মানুষ নন, বরং দিয়েছেন দেশের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি শ্রী সুরেন্দ্রকুমার সিনহা। শেখ হাসিনাকে তিনি অতি কাছে থেকে দেখেছেন। এক কালে তিনি তারই দলের লোক ছিলেন। হাসিনাকে এখনো যারা পুরাপুরি চিনেনি তাদের উচিত শ্রী সিনহার লেখা এবং সম্প্রতি প্রকাশিত আত্মজীবনী মূলক বই এ ব্রোকেন ড্রিম: রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস এন্ড ডেমোক্রেসিটি পড়া। বইটি এখন আমাজনে কিনতে পাওয়া যাচ্ছে।

 

শ্রী সুরেন্দ্রকুমার সিনহা ভূমিকায় বলেছেন, সরকারের চাপ এবং হুমকির মুখে তাঁকে দেশত্যাগ করতে হয়েছে। কীভাবে তাকে দেশত্যাগ বাধ্য করা হয়েছে -সে বিষয়ে তাঁর বইতে থেকে কিছু তুলে ধরা যাকঃ প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর দলের অন্যান্য সদস্য ও মন্ত্রীরা পার্লামেন্টের বিরুদ্ধে যাবার জন্য আমার কঠোর নিন্দা করেন। প্রধানমন্ত্রীসহ ক্যাবিনেট মন্ত্রীরা আমার বিরুদ্ধে অসদাচরণ এবং দুর্নীতির অভিযোগ এনে বদনাম করতে শুরু করেন।’‘আমি যখন আমার সরকারি বাসভবনে আবদ্ধ, আইনজীবী এবং বিচারকদের আমার সাথে দেখা করতে দেয়া হচ্ছিল না, তখন সংবাদমাধ্যমকে বলা হয় - আমি অসুস্থ. আমি চিকিৎসার জন্য ছুটি চেয়েছি।’‘

 

একাধিক মন্ত্রী বলেন, আমি চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাবো।’‘অক্টোবরের ১৪ তারিখ, যখন আমি দেশ ছাড়তে বাধ্য হই - তখন একটি প্রকাশ্য বিবৃতিতে আমি পরিস্থিতি স্পষ্ট করার চেষ্টায় একটি বিবৃতি দেই যে, "আমি অসুস্থ নই এবং আমি চিরকালের জন্য দেশ ছেড়ে যাচ্ছি না।’‘ আমি আশা করছিলাম যে আমার প্রত্যক্ষ অনুপস্থিতি এবং আদালতের নিয়মিত ছুটি - এ দুটো মিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সহায়ক হবে, এবং শুভবুদ্ধির উদয় হবে, সরকার ওই রায়ের যে মর্মবস্তু - অর্থাৎ বিচারবিভাগের স্বাধীনতা যে জাতি ও রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর - তা বুঝতে পারবে।’‘শেষ পর্যন্ত দেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা - যার নাম ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স - তাদের ভীতি প্রদর্শন এবং আমার পরিবারের প্রতি হুমকির সম্মুখীন হয়ে আমি বিদেশ থেকে আমার পদত্যাগপত্র জমা দেই।

 

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বিষয়টি নিয়ে বিবিসির সাথে সাক্ষাতকারও দিয়েছেন। গত বছরের নানা নাটকীয় ঘটনাবলীর পর কোন গণমাধ্যমে এটিই ছিল তার প্রথম সাক্ষাৎকার। তিনি সাক্ষাতকারে বলেন, আমাকে যখন পুরাপুরি হাউজ এ্যারেস্ট করা হলো, ...তখন বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিদিন একজন করে ডাক্তার আমার কাছে পাঠানো হতো। আমি নি:শ্বাস নিতে পারছিলাম না।’‘এর মধ্যে ডিজিএফআইয়ের চিফ এসে বললেন, হ্যাঁ আপনাকে বলা হলো আপনি বিদেশ যাবেন, আপনি যাচ্ছেন না।’‘আমি বললাম: কেন যাবো আমি বিদেশে?’‘আপনি চলে যান, আপনার টাকা পয়সার আমরা ব্যবস্থা করছি।’‘আমি বললাম, এটা হয় না, আমি আপনাদের টাকা নেবো না। আর আপনারা বললেই আমি ইয়ে করবো না। আমি চাই সরকার প্রধান প্রধানমন্ত্রীর সাথে আমি আলাপ করি । ব্যাপারটা কি হয়েছে আমি জানতে চাই। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী আপনার সাথে কথা বলবেন না।

 

বাংলাদেশের পার্লামেন্টে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে সংবিধান সংশোধন করে বিচারপতিদের ইমপিচ করার ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের পরিবর্তে পার্লামেন্টের সদস্যদের দেবার পর ২০১৬ সালের ৫ই মে হাইকোর্ট ডিভিশনের একটি বিশেষ বেঞ্চ ওই সংশোধনীকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেয়। সরকার এর বিরুদ্ধে আপীল করে, এবং সাত সদস্যের একটি বেঞ্চে আপীলের শুনানী হয়। সাবেক বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা তার বইতে লেখেন, জুলাইয়ের ৩ তারিখ প্রধান বিচারপতি হিসেবে তার সভাপতিত্বে সুপ্রিম কোর্ট বেঞ্চ আপীল খারিজ করে হাইকোর্ট ডিভিশনের রায় বহাল রাখে। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসের ১ তারিখ সর্বসম্মত রায়ের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশিত হয়। তিনি লেখেন, ওই সিদ্ধান্তের পর সেপ্টেম্বরের ১৩ তারিখে পার্লামেন্ট একটি প্রস্তাব পাস করে - যাতে সেই রায়কে বাতিল করার জন্য আইনী পদক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়।

 

বইটি প্রকাশের পর থেকেই সরকারি দলের পক্ষ থেকে সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে বিষোদগার শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সুরেন্দ্র কুমার সিনহার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। প্রশ্ন হলা, তবে কি শেখ হাসিনা এরূপ পাগল-ছাগলকে বিচারপতি রূপ দেশের সর্বোচ্চ আদালতে নিয়োগ দিয়েছেন? আরো যারা দেশের উচ্চ আদালতে ও প্রশাসনের উচ্চপদে নিয়োগ পেয়ে বসে আছে -তারা যে পাগল-ছাগল নয় -সে নিশ্চয়তা কে দিবে? ওবায়দুল কাদের যে নিজে মানসিক ভাবে সুস্থ্য -সে রায়টিই বা কোত্থেকে পাওয়া যাবে? সরকারের বিরুদ্ধে গেলেই পাগল, আর পক্ষে থাকলে সে সুস্থ্য এটি কি কোন ব্যক্তির মগজের সুস্থ্য বিচারের মানদণ্ড হতে পারে?

 

সম্প্রতি সরকারি দলের পক্ষ থেকে ড. কামাল হোসেনের ডিগবাজী নিয়ে বিজ্ঞাপণ ছাপা হয়েছে। অথচ মুজিব ও হাসিনার ডিগবাজিগুলি নিয়ে তারা নিশ্চুপ। মানুষ কি ভূলে গেছে মুজিবের এক ডিগবাজিতেই গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘটেছে এবং প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বাকশালী স্বৈরতন্ত্র।এবং হাসিনার ডিগবাজিতে বিলুপ্ত হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধি। যারা এরূপ ডিগবাজিতে পটু তারা কি নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিষয়েও ডিগবাজি না দিয়ে পারে? এখন এটি আর কোন গোপন বিষয় নয় যে, হাসিনার মাঝে নীতি-নৈতিকতা বলে কিছু নাই। যা আছে তা হলো, যে কোন রূপে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার অদম্য নেশা। এরূপ নেশাতে নিরাপদ মানুষদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা, গুম করা বা কারারুদ্ধ করা -কোন ব্যাপারই নয়কোন ব্যাপার নয় ভোট ডাকাতি করা। হাসিনার সরকার বছরের পর বছর সেটি করছে। এরূপ নেশাগ্রস্তের কাছ থেকে নিরপেক্ষ নির্বাচন একমাত্র তারাই আশা করতে পারে যারা নিজেরাও হারিয়েছে নীতি জ্ঞান ও মানসিক সুস্থ্যতা।

 

 

একমাত্র পথ গণঅভ্যুত্থান

স্বৈরশাসকদের হাতে থাকে ভোট-ডাকাতির সকল কলাকৌশল। সংসদের অধিকাংশ সিট দখল করা তাদের জন্য কোন ব্যাপারই নয়। ভোট ডাকাতির সে সামর্থ্য স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদ যেমন প্রমাণ করেছেন, তেমনি শেখ হাসিনাও প্রমাণ করেছেন। এরজন্যই তাদের বিরুদ্ধে নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দিতা সুফল দেয় না। এরশাদের অধীনে নির্বাচনে নেমেছে আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী, খেলাফত আন্দোলন, জাসদ, ফ্রিডম পার্টি এবং আরো কিছু দল; কিন্তু তাতে স্বৈরাচারি শাসকের পতন দূরে থাক তার গায়ে আঁচড়ও লাগেনি। বরং তাদের অংশগ্রহণ এরশাদের অবৈধ সরকারকে দীর্ঘকাল বৈধতা দিয়েছে। এরশাদের পতন ঘটেছে গণঅভ্যুত্থানে। নির্বাচনে না গিয়ে সকল দল মিলে গণঅভ্যুত্থানের পথ ধরলে এরশাদের আগেই পতন হতো। এক শৃগাল আরেক শৃগালের নিপাত চায় না। সেটি স্বৈরাচারিদের ক্ষেত্রেও। তাই হাসিনা অতীতে এরশাদের নিপাত চায়নি; একই কারণে এরশাদও আজ চায় না হাসিনার নিপাত। বরং এরশাদ যখন এক গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতায় আসে তখন যে দলটি তাকে স্বাগত জানায় -সেটি হলো আওয়ামী লীগ। এতে বুঝা যায় দলটির স্বৈরাচার প্রেম। আরো বাস্তবতা হলো, নির্বাচনের ন্যায় অস্ত্রবলেও স্বৈরশাসকদের হারানো যায় না। কারণ তাদের হাতে থাকে অস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার। থাকে সেবাদাস চরিত্রের বিশাল প্রশাসন, ক্যাডার বাহিনী, পুলিশ ও সেনাবাহিনী। স্বৈরশাসকদের কাজ, জনগণের পকেট থেকে অর্থ নিয়ে অনুগত চাকর-বাকর প্রতিপালন। এরূপ বেতনভোগী দাসদের সাহায্য নিয়ে সিরিয়ার স্বৈরাশাসক  বাশার আল-আসাদ প্রায় ছয় লাখ মানুষকে হত্যা করেছে এবং ৬০ লাখের বেশী মানুষকে তাদের ঘরবাড়ী থেকে তাড়িয়ে রিফিউজি বানিয়েছে। এবং সেটি  স্রেফ গদিতে টিকে থাকার স্বার্থে।


গদিরক্ষার কাজে প্রতিটি স্বৈরাচারি শাসকই অতিশয় বর্বর ও নৃশংস হয়। সে নৃশংস বর্বরতা বাংলাদেশের মানুষ ১০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্ত্বরে দেখেছে। সেটি মিশরের মানুষ দেখেছে ২০১৩ সালে কায়রোর রাবা আল আদাবিয়া ময়দানে। দুটি স্থানেই শান্তিপূর্ণ সমাবেশে অংশ নেয়া শত শত নিরস্ত্র ও নিরপরাধ মানব হত্যায় ট্যাংক, কামান, মেশিনগান ও ভারি গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছে। রাজপথ পরিণত হয়েছে বধ্যভূমিতে। ময়লা সরানোর ন্যায় সেখান থেকে নিহতের লাশ সরানো হয়েছে। জনগণের রাজস্বে পালিত পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে সরকার এভাবে নিজেদের কুমতলব পূরণে চাকর-বাকরের ন্যায় ব্যবহার করেছে। তবে ইতিহাসের আরেক সত্য হলো, স্বৈরশাসকদের হাতে এরূপ দুর্বৃত্ত শ্রেণীর বেতনভোগী চাকর-বাকর বিপুল সংখ্যায় থাকলেও তাদের প্রকৃত বন্ধু বা আপনজন বলে কেউ নেই প্রতি সমাজেই সুযোগসন্ধানী নানারূপ দুর্বৃত্ত থাকে। তারা সহজেই স্বৈরশাসকদের চাকর-বাকরে পরিণত হয় নিছক নিজেদের সুবিধা হাছিল ও অর্থপ্রাপ্তির লোভে। এমন লক্ষ লক্ষ সেবাদাস পেয়েছে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকগণও। স্বৈরশাসকদের ন্যায় এরূপ সেবাদাসদের কাছেও তাদের নিজেদের স্বার্থটাই বড় স্বৈরশাসকের স্বার্থ বাঁচাতে  নিজেদের জান দেয়াতে তাদের নিজেদের স্বার্থ যে বাঁচে না সেটি তারা বুঝে। তাছাড়া স্বৈরশাসক বাঁচানোর কাজটি জিহাদ নয় যে একাজে মরলে জান্নাত মিলবে। বরং তাতে যে জাহান্নামে যাওয়াটিই সুনিশ্চিত হয় সেটি বুঝে উঠা কি এতই কঠিন? ফলে গণঅভ্যুত্থানের বেগ দেখলে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও গোয়ান্দা বিভাগের লোকেরা স্বৈরশাসকের পাশে দাঁড়ায় না, সরকারের পক্ষ ছেড়ে দ্রুত জনগণের পক্ষে যোগ দেয়। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে তাদেরকে জনগণের উপর গুলি চালানোর হুকুম দেয়া হলেও তাতে রাজী হয় না। স্বৈর শাসকের সে বিপদের মুহুর্তে তাদের লক্ষ্য হয়, নিজেদের পিঠের চামড়া বাঁচানো, স্বৈরশাসককে বাঁচানো নয়। এভাবে সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যেও শুরু হয় স্বৈর-সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। বিশ্বের সকল স্বৈরাচার বিরোধী গণঅভ্যুত্থানেই সেটি দেখা গেছে।

 

স্বৈরসরকারের চাকর-বাকরেরাও জানে, তাদের বেতন স্বৈরশাসক নিজের পকেট থেকে দেয় না, দেয় জনগণ। এবং বেতন দেয় যে জনগণ, তাদেকে হত্যা করা যে অমার্জনীয় অপরাধ সেটি কে না বুঝে? সে অপরাধের শাস্তি থেকে বাঁচতেই পরাজয় দেখলে দলে দলে স্বৈরাচারের পক্ষ ছাড়ে মোসাহেবী চরিত্রের পত্র-পত্রিকা, টিভি ও মিডিয়ার লোকজনও। গণরোষ থেকে প্রাণ বাঁচাতে এজন্যই স্বৈরশাসকদের হয় একাকী দেশ ছাড়তে হয়, নতুবা গণরোষে একাকী লাশ হতে হয়। বিপদের দিনে তাদের পাশে কেউ থাকে না। তখন লাশ মাটিতে পড়ে থাকলেও জানাজা পড়া ও দাফন করার লোক থাকে না। ক্ষমতা থেকে অপসারিত হলে তাদের পক্ষে কথা বলারও কেউ থাকে না। বরং এক কালের সাথীরাই উল্টো সুরে কথা বলা শুরু করে। তাই শেখ মুজিবের পতনের পরক্ষণেই এককালের আওয়ামী লীগ সভাপতি জনাব আব্দুল মালেক উলিক বলেছিলেন, ফিরাউনের পতন হয়েছে" আওয়ামী লীগের দলীয় পত্রিকা দৈনিক ইত্তেফাক তার মৃত্যুতে সামান্যতম দুঃখ প্রকাশ করেনি। কোন সম্পাদকীয় বা উপসম্পাদকীয়ও লেখেনি। যারা এক কালে তাকে নেতা রূপে মাথায় তুলেছিল, তাঁরাও তাঁর মৃত্যুতে কোন শোক সভা করেনি। জানাযা বা গায়েবানা জানাযাও পাঠ করেনি।

 

 

আসন্ন রাজনৈতিক ভূমিকম্প

ভূমিকম্প শুরু হওয়ার আগের সবার চোখের অগোচরে জমিনের নীচে তোলপাড় শুরু হয়। সে তোলপাড়েরই ভয়ানক ফলটি হলো ভূমিকম্প। দেশের রাজনীতিতেও তেমনি ভূমিকম্প আসার আগে তোলপাড় শুরু হয় জনগণের চেতনা-রাজ্যে। বাংলাদেশের জনগণের চেতনায় সেরূপ তোলপাড় যে চরম পৌঁছেছে তার আলামত তো প্রচুর। জমিনের ভূমিকম্প রোধের সামর্থ্য কোন  সরকারের থাকে না। তেমনি সামর্থ্য থাকে না রাজনৈতিক ভূমিকম্প রক্ষার সামর্থ্যও। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ লিবিয়া, তিউনিসিয়া, মিশর বা ইরানের জনগণের চেয়ে সংখ্যায় কম নয়, দুর্বলও নয়। শেখ হাসিনাও মিশরের হোসনী মোবারক, লিবিয়ার গাদ্দাফী, রাশিয়ার জার বা ইরানে শাহের চেয়ে শক্তিশালী নয়। এখানেই স্বৈরশাসনের নিপাতে বিশাল আশাবাদ। তাছাড়া বাংলাদেশের বুকে রাজনৈতিক ভূমিকম্প যে অতি আসন্ন -সেটির উত্তাপ প্রবল ভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। দেশের মানুষ এখন জেগে উঠেছে। প্রতিটি রাজনৈতিক ভূমিকম্পের শুরু তো এখান থেকেই। কোথায় রোগ এবং সে রোগের জীবাণুর উৎসটি কোথায় -তা নিয়ে জনগণের মনে এখন আর কোন সংশয় নেই্। রোগ মুক্তির পথে এমন বোধোদয়টি যেমন দৈহীক রোগের ক্ষেত্রে অপরিহার্য, তেমনি অপরিহার্য দেশে রাজনীতির ক্ষেত্রেও ভয়ানক রোগের কারণটি জানা গেলে ভুক্তভোগীগণ তখন রোগমুক্তির লক্ষ্যে নিজেরাই উদ্যোগী হয়।

 

শেখ হাসিনার বিগত ১০ বছরের নৃশংস স্বৈরশাসন জনগণের মনে যে পরিমান ঘৃনা উৎপাদন করেছে সেটি কি হাজার হাজার জনসভা করেও সম্ভব ছিল? সম্ভব ছিল কি দশ-বিশটি দৈনিক পত্রিকা বা টিভি চ্যানেল খুলে? রোগজীবাণু বা বনের হিংস্র পশু যেমন নিজের নাশকতা নিজেই জানিয়ে দেয়, তেমনি জানিয়ে দেয় স্বৈরশাসকগণও। ইরানের শাহ বা মিশরের স্বৈরশাসক হোসনী মোবারকের স্বৈর-শাসনের বিরুদ্ধে জনগণকে জাগিয়ে তুলতে তাই বিরোধী দলের মিটিং-মিছিল করতে হয়নি। টিভি চ্যানেল বা পত্র-পত্রিকাও প্রকাশ করতে হয়নি। মিছিল-মিটিং ও পত্রিকা প্রকাশের অধিকার না থাকাতেও স্বৈরশাসক নির্মূলের ভূমিকম্প সেগুলিতে থেমে থাকেনি। একই পথে দ্রুত এগুচ্ছে বাংলাদেশ। হাসিনার স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ঘৃণাপূর্ণ গভীর লাভা জমেছে এমন কি কিশোর-কিশোরীদের মনেও। সে ঘৃনা নিয়েই সম্প্রতি রাস্তায় নেমেছিল স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীগণ। তেমন আগ্নেয় লাভা জমেছিল মুজিবের বিরুদ্ধেও। শেখ মুজিব সকল দল, পত্র-পত্রিকা ও জনসভা নিষিদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু তাতে তাঁর গদি বাঁচেনি। এমন কি তাঁর নিজের জীবনও বাঁচেনি।

 

আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সৌভাগ্য হলো, ১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থানে শেখ মুজিব নিহত হলেও আওয়ামী লীগ বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক ভূমিকম্পে শুধু স্বৈরশাসক নিপাত যায় না। নিপাত যায় তার পারিবারীক ও রাজনৈতিক গোত্র। মারা পড়ে স্বৈরাচারের রাজনৈতিক আদর্শও। সামরিক অভ্যুত্থান থেকে রাজনৈতিক ভূমিকম্পের এখানেই মূল পার্থক্য। তাছাড়া জনগণের কাছে এখন যে বিষয়টি অতি পরিস্কার তা হলো, ফ্যাসিবাদের ক্যান্সারটি শেখ মুজিব বা শেখ হাসিনার একার বা তাদের পরিবারীক রোগ নয়। সেটি মূলতঃ আওয়ামী লীগের দলীয় রোগ তাই মুজিব মারা গেলেও ফ্যাসিবাদের ক্যান্সার শুধু বেঁচে নেই, চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে বরং দেশের আনাচে কানাচে জন্ম নিয়েছে ফ্যাসিবাদের চেতনাধারি হাজার হাজার মুজিব ও হাসিনা। এরই ফলে রাজনীতির অঙ্গণে সৃষ্টি হয়েছে ফ্যাসিবাদের জোয়ার। ফলে উধাও হয়েছে গণতন্ত্র এবং নিষিদ্ধ হয়েছে রাজপথের মিটিং-মিছিল। এবং অবাধ হয়েছে সরকারি সন্ত্রাস, গুম, খুন এবং দমন ফ্যাসিবাদের সে নৃশংস বর্বরতা থেকে মুক্তি পেতে জার্মানবাসীগণ শুধু হিটলারের শাসনকেই নির্মূল করেনি, নির্মূল করেছে তার মতবাদ ও  দলকে। ফলে ফ্যাসিবাদের পক্ষে কথা বলা সেদেশে ফৌজদারি অপরাধ। বাংলাদেশীদের সামনেও কি ভিন্ন পথ আছে?

 

 

উম্মোচিত আওয়ামী চরিত্র ও ইতিহাস

আওয়ামী লীগ এখন আর অজানা শক্তি নয়। প্রকাশ পেয়েছে তার প্রকৃত দর্শন, চরিত্র ও ইতিহাস। কোনটি আগুণ আর কোনটি বরফ -সেটি জানার জন্য কি ইতিহাস পাঠের প্রয়োজন পড়ে? নিরক্ষর মানুষও সেটি টের পায়। তেমনি আওয়ামী লীগের চরিত্রও গোপন বিষয় নয়। জনগণের চোখের সামনে দলটি তার প্রকৃত পরিচয় নিয়ে দীর্ঘকাল যাবত হাজির। যে কোন গণবিপ্লবের জন্য স্বৈরাচারি শক্তির সঠিক পরিচয়টি জরুরী। ইতিহাসের অতি শিক্ষণীয় বিষয় হলো, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই দেশ ও দেশবাসীর মুখে কালিমা লেপন শুরু হয়। সেটি পাকিস্তান আমল থেকেই পাকিস্তান আমলে গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী এ দলটি পাকিস্তানের মুখে কালিমা লাগায় ঢাকাস্থ্ প্রাদেশিক সংসদের অভ্যন্তরে ডিপুটি স্পীকার শাহেদ আলীকে হত্যা করে। এমন বর্বরতা পাকিস্তানের অন্য ৪টি প্রাদেশিক পরিষদের কোনটিতেই ঘটেনি। কারণ সে প্রদেশগুলির আওয়ামী লীগ ছিল না। দলটি তার অতিকায় কদর্য রূপটি দেখিয়েছে ১৯৭১য়ে। মুজিবের অনুসারিদের হাতে নিহত হয়, ধর্ষিতা হয় এবং ঘর-বাড়ী, চাকুরি-বাকুরি ও ব্যবসা-বাণিজ্য হারিয়ে রাস্তার পাশে বস্তিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয় বহু লক্ষ অবাঙালী মুসলিম। আজ যে বর্বরতা মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের জীবনে নেমে এসেছে, সেরূপ বর্বতার শিকার হয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ভারত থেকে প্রাণ বাঁচাতে আসা অবাঙালীগণ। বাংলার ইতিহাসে আর কোন কালেই এমন নৃশংসতা ঘটেনি। তবে নৃশংসতা সেখানেই থেমে যায়নি, হাসিনার শাসনামলে অবাঙালীদের বস্তিগুলোতে আগুণও দেয়া হচ্ছে। মায়ানমারে যেমন বার্মিজ অপরাধীদের শাস্তি না দিয়ে প্রশ্রয় দেয়া হয়, বাংলাদেশেও তেমনি আওয়ামী লীগের অপরাধীদের শাস্তি না দিয়ে প্রশ্রয় দেয়া হয়। বরং বলা যায়, মায়ানমারের ফ্যাসিবাদি শাসকচক্রের খুনিরা আওয়ামী লীগারদেরই আদর্শিক আত্মীয়। মানব জীবনের সবচেয়ে বড় ভীরুতা, কাপুরুষতা ও বেঈমানী হলো চোখের সামনে অন্যায় হতে দেখেও নিশ্চুপ থাকা। পবিত্র কোরআনে মুসলিম উম্মাহকে মানব জাতির মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি বলা হয়েছে। তবে সেটি এজন্য নয় যে তারা বেশী বেশী নামায-রোযা করে। বরং এজন্য যে তারা অন্যায়কে নির্মূল করে এবং ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করে। -(সুরা আল ইমরান আয়াত ১১০ দ্রষ্টব্য)। অথচ আওয়ামী বাকশালীদের মিশনটি এর বিপরীত। নিজ দলের নেতা-কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের মাঝে তারা প্রতিষ্ঠা দিয়েছে অসত্য ও অন্যায়কে। এবং প্রবলতর করেছে অসত্য ও অন্যায়ের সামনে নিশ্চুপ থাকার সংস্কৃতিকে। একাত্তরে ৩০ লাখ নিহতের কিসসা তো এভাবেই বাজার পেয়েছে। নৃশংসতার বিরুদ্ধে নীরবতা এতটাই প্রবল, যেন একাত্তরে অবাঙালীদের বিরুদ্ধে কিছুই করা হয়নি। যেন প্রায় ৫ লাখ অবাঙালী মুসলিম নিজেরাই নিজেদের ঘরবাড়ী ছেড়ে বস্তিতে গিয়ে উঠেছে। সে সাথে শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য হচ্ছে সত্য কথা বলা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নামাটি। সম্প্রতি কিশোর বিদ্রোহীদের উপর পুলিশ ও দলীয় ক্যাডারদের লেলিয়ে দেয়ার হেতু তো সেটি।

 

একাত্তেরর পর মুজিবের ফ্যাসিবাদী নৃশংসতা এবং ভারতের পদসেবার রাজনীতি থেকে পাকিস্তান বেঁচে গেছে। সে বাঁচার কারণে পাকিস্তান পরিণত হয়েছে পারমানবিক শক্তিতে। সামরকি শক্তিতে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে পাকিস্তানের সমকক্ষ অন্য কোন দেশ নেই। তাতে সামর্থ্য পেয়েছে ভারতের সামনে শক্ত মেরদণ্ড নিয়ে দাঁড়ানোর। দেশটিতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছ বহুদলীয় গণতন্ত্র। কিন্তু সে নৃশংসতা এবং ভারতের পদসেবার রাজনীতি থেকে বাংলাদেশ বাঁচেনি। নিহত হয়েছে গণতন্ত্র। বাংলার মাটিতে আজ থেকে ৬৪ বছর পূর্বে ১৯৫৪ সালে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেরূপ একটি নির্বাচনের কথা আজ কল্পনা করাও অসম্ভব। মুজিবের আগরতলা ষড়যন্ত্র ১৯৬৮ সালে সফল হয়নি। কিন্তু সফল হয়েছে ১৯৭১য়ে। ফলে ১৯৭১য়ে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশ পরিচিতি পায় ভারতের আশ্রিত রাষ্ট্র রূপে। ফলে চীন, ইরান, সৌদি আরব, তুরস্কসহ বিশ্বের বহুদেশ স্বাধীন দেশ রূপে স্বীকৃতি দিতে ইতস্ততঃ করেছে।

 

মুজিবের হাতে বাংলাদেশের মুখে কালিমা লেপনের অতি কুৎসিত কর্মটি হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে বাংলাদেশকে ভিক্ষার তলাহীন ঝুলি বানানোর মধ্য দিয়ে। মুজিব ও প্রভূ রাষ্ট্র ভারতের অর্থনৈতিক নাশকতার কারণে জন্ম নেয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। কংকালসার বাংলাদেশী শিশু পরিণত হয়ে ভিক্ষা সংগ্রহের আন্তর্জাতিক পোস্টার  শিশুতে। সোনার বাংলা রূপে পরিচিত দেশটির এমন ইজ্জতহানি আর কোন কালেই হয়নি। মুজিবের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশীর মৃত্যু হয়েছিল। তবে দুর্ভিক্ষের দিনেও মুজিব ইতিহাস গড়েছেন অন্য ভাবে। দেশের সে দুর্দিনে তিনি পুত্রকে বিয়ে দিয়েছেন মাথায় সোনার মুকুট পড়িয়ে। গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়ে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন বাকশালী স্বৈরাচার। পিতার সে পথটি ধরেছেন শেখ হাসিনাও। মুজিবের ন্যায় তিনিও ডিগবাজি দিলেন গণতান্ত্রিক রাজনীতি থেকে। পিতার ন্যায় তিনিও হত্যা করলেন গণতন্ত্র। পুলিশ ও সেনা বাহিনী পরিণত হলো তার লাঠিয়ালে। দেশের আদালত পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক শত্রুদের ফাঁসিতে হত্যা বা কারারুদ্ধ করার হাতিয়ারে। নির্বাচনের নামে এমন ভোট-ডাকাতি শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়, সমগ্র মানব ইতিহাসেও বিরল। তবে সবচেয়ে বড় নাশকতাটি ঘটেছে ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধ নির্মূলের ক্ষেত্রে। সেটি ব্যাপক ভাবে হলে জনগণ হারায় দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তদের ঘৃনা করার সামর্থ্য। চোর-ডাকাতগণ নেতা-নেত্রী, বন্ধু, পিতা ও ফিরাউনের ন্যায় ভগবানরূপে গণ্য হয় তো বিবেকের অঙ্গণে ব্যাপক নাশকতার কারণেই।

 

ঘৃনার রাজনীতি ঘৃনাই জন্ম দেয়; তাতে ভাতৃত্ব ও পারস্পরিক সম্প্রীতি জন্ম নেয় না। আওয়ামী লীগের ঘৃনা ও নাশকতার রাজনীতিতে ধ্বসে গেছে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তার ভিত্তি। বেড়েছে স্বৈরাচার বিরোধী তীব্র ঘৃণা। ফলে শত শত পুলিশ প্রহরা ছাড়া রাস্তায় নামার সাহস শেখ হাসিনার নেই তাঁর আশে পাশে যারা ঘুরাফেরা করে তারা উচ্ছিষ্টভোগী চাকর-বাকর মাত্র এমন কি তাঁর দলীয় নেতাকর্মীগণও তাঁকে সুরক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে অসহায়। শেখ হাসিনাকে তারা আর কি প্রহরা দিবে, তারা নিজেরাও পিঠের চামড়া বাঁচাতে পুলিশ, RAB ও সেনাবাহিনীর উপর নির্ভরশীল। শেখ হাসিনার সামনে এখন উভয়মুখি সংকট; পালাবার রাস্তা নাই। নিরপেক্ষ নির্বাচনে তাঁর পরাজয় অনিবার্য। অপর দিকে ভোট-ডাকাতির নির্বাচন হলে অনিবার্য হবে গণবিদ্রোহ। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্তির মূল কারণ তো পরাজয়-ভীতি। সেটি নিরক্ষর মানুষও বুঝে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বদলে নির্বাচন প্রক্রিয়ার উপর প্রতিষ্ঠা করেছেন নিরংকুশ নিজের দখলদারি। কৌশলটি হলো, নির্বাচনি কমিশনারের নামে দলীয় রিফারীকে ময়দানে নামানো। যার মূল কাজটি হবে, বিরোধী দলীয় প্রার্থীদের লাল কার্ড দেখিয়ে নির্বাচনের ময়দান থেকে বেড়ে করে দেয়া; এবং পেনাল্টি করলেও সরকার দলীয়দের পুরস্কৃত করা। নির্বাচনি কমিশনারের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই জামায়াতে ইসলামীকে লাল কার্ড দেখানো হয়েছে। লাল কার্ড দেখানো হচ্ছে খালেদা জিয়া ও তাঁর পুত্র তারেক জিয়াকেও। একাজে ব্যবহৃত হচ্ছে দেশের আদালত। বিরোধী দলীয় নেতাদের ফাঁসি ও কারারুদ্ধ করা হচ্ছে তো সে পরিকল্পনার অংশ রূপে।

 

 

লাইফ সাপোর্টে স্বৈর-সরকার

এমন কি কিশোর বিদ্রোহ রুখতে রাস্তায় হাজার হাজার পুলিশ নামানোর ঘটনা তো এটিই সাক্ষ্য দেয়, শেখ হাসিনা হারিয়েছেন নিজ শক্তিতে বাঁচার সামর্থ্য। তাঁর স্বৈরশাসন বেঁচে আছে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, পুলিশ, RAB ও ভারতীয় সরকারের দেয়া লাইফ সাপোর্টে। লাইফ সাপোর্টটি তুলে নিলে হাসিনার সরকার যে সাথে সাথে বিলুপ্ত হবে তা নিয়ে কি সামান্যতম সন্দেহ আছে? অপর দিকে স্বৈরশাসনকে সমর্থণ করার বদনামটি তো বিশাল। প্রতিটি সভ্য সমাজেই অতি অসভ্য নিন্দিত কাজটি হলো, চোর-ডাকাতদের সমর্থণ দেয়ার ন্যায় ভোট-ডাকাতদের সমর্থণ করা ভারতের বুদ্ধিজীবী মহলে ইতিমধ্যেই ভারতের এ নীতির বিরুদ্ধে গুঞ্জন উঠেছে। কারণ ভারতে শুধু নরেন্দ্র মোদির বাস নয়, সেদেশে অরন্ধতি রায়ের মত ব্যক্তিও আছেন। ভারত সরকার হাসিনার স্বৈরশাসনকে সাপোর্ট দেয় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিছক তার নিজ স্বার্থ বাঁচাতে। কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের স্বার্থ প্রচণ্ড হামলার মুখে পড়বে -যদি ভারত সরকার গণবিরোধী স্বৈরশাসককে সমর্থণ দেয়ার কাজটি অব্যাহত রাখে। জনগণ মারমুখি হলে ভারত যে নিজের স্বার্থ বাঁচাতে হাসিনার উপর থেকে লাইফ সাপোর্ট উঠিয়ে নিবে -তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? কারণ, ভারতের কাছে তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থটি বড়, হাসিনা নয়।

 

কাশ্মীরে মুসলিম গণহত্যা ও হাজার হাজার মুসলিম নারীকে ধর্ষণের কারণে পাকিস্তানের মাটিতে ভারতপন্থি হওয়াটি গুরুতর নৈতীক ও রাজনৈতিক অপরাধ। সেটি গণ্য হয় মানবতাহীন নিরেট অসভ্যতা রূপেও। একই অবস্থা নেপালে। কারণ, দিল্লির আধিপত্যবাদী সরকার নেপালের রাজনীতিতে তার অনুগতদের প্রতিষ্ঠা দিতে ও নেপালী সরকারের মেরুদণ্ড ভাঙ্গতে ভারতের উপর দিয়ে নেপালে জ্বালানী তেলসহ ও অন্যান্য সামগ্রী বহনকারি ট্রাক চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল এবং এভাবে জন্ম দিয়েছিল চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক দুরাবস্থার নেপালের মানুষ ভারতসৃষ্ট সে যাতনার কথা ভূলেনি। একইরূপ প্রচণ্ড ভারত-বিরোধী ঘৃনা মালদ্বীপ ও শ্রীলংকায়। সেরূপ অবস্থা দ্রুত জন্ম নিচ্ছে বাংলাদেশেও। আরো বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ হিন্দুসংখ্যাগরিষ্ঠ নেপাল নয়; ক্ষুদ্র মালদ্বীপ বা শ্রীলংকাও নয়। এটি ১৭ কোটি মানুষের মুসলিম দেশ। বাঙালী মুসলিমগণ বিশ্বের অন্যান্য দেশের স্বৈরাচার বিরোধী জনগণের তুলনায় রাজনীতির অঙ্গণে ঐতিহ্যহীনও নয়। বরং তাদের রয়েছে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গৌরবময় ইতিহাস। এই বাঙালী মুসলিমগণই ১৯৪৭ সালে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে প্রকাণ্ড ভূমিকম্প এনেছিল এবং পাল্টে দিয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র। কায়েদে আজম মুহম্মদ আলী জিন্নাহর পাকিস্তান আন্দোলনের মূল দুর্গটি ছিল বাংলায়; পাঞ্জাব, উত্তর প্রদেশ, সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু বা ভারতীয় উপমহাদেশের অন্য কোন প্রদেশে নয়।

 

বাংলার বুকে মুসলিম লীগের জন্মই শুধু হয়নি, বরং সমগ্র ভারত মাঝে এ বাংলাতেই প্রতিষ্ঠা পায় মুসলিম লীগের প্রথম এবং একমাত্র দলীয় সরকার সিন্ধু ও পাঞ্জাবে মুসলিম লীগের সরকার প্রতিষ্ঠা পায় স্বাধীনতা লাভের পূর্ব মুহুর্তে। ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগষ্ট জিন্নাহর ঘোষিত লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তানয়ের ডাকে সাড়া দিয়ে কলকাতার রাজপথে প্রায় ৭ হাজার বাঙালী মুসলিম প্রাণ দিয়েছিল কংগ্রেসী গুণ্ডাদের হাতে। অন্য কোন প্রদেশে সেরূপ প্রাণদানের ঘটনা ঘটেনি। বাঙালী মুসলিমদের রক্তদানের ফলে পাকিস্তানের অনিবার্যতা বুঝাতে মুহম্মদ আলী জিন্নাহকে আর কখনোই ব্রিটিশ সরকার ও কংগ্রেস নেতাদের সামনে নতুন করে উকিলসুলভ যুক্তিতর্ক পেশ করতে হয়নি। অবিভক্ত ভারতে হিন্দু-মুসলিমের একত্রে অবস্থান যে অসম্ভব -সেটি বুঝে ফেলে। ফলে ত্বরিৎ মেনে নেয় পাকিস্তান দাবীকে। বাঙালী মুসলিমগণ এভাবেই সেদিন ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছিল আধিপত্যবাদী হিন্দুদের অখণ্ড ভারত নির্মাণের স্বপ্ন। কলকাতার রাজপথে তাদের রক্তদানের ফলেই দ্রুত প্রতিষ্ঠা পায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান। বাঙালী মুসলিমের সর্বকালের ইতিহাসে এটিই হলো তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান। পাকিস্তানের সংখ্যগরিষ্ঠ বাঙালী জনগোষ্ঠি ১৯৭১য়ে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও দেশটি এখনো টিকে আছে ৫৭টি মুসলিম দেশের মাঝে সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি রূপে যার ভাণ্ডারে রয়েছে শতাধীক পারমানবিক বোমা। ১৭৫৭ সালে পলাশীর ময়দানে বাঙালী মুসলিমগণ পরাজয় রুখতে পারেনি, কিন্তু ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠি রূপে নিজেদের দায়বদ্ধতা কিছুটা হলেও পুষিয়ে দিয়েছে।

 

 

নতুন দিনের আশাবাদ

সেদিন বেশী দূরে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার বুকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশ আবারো ১৯০৬-৪৭য়ের ন্যায় রাজনীতির পাওয়ার হাউসে পরিণত হবে। সেটি ভারতসহ সকল ইসলামি বিরোধী শক্তি বুঝে। শেখ হাসিনা সে ভয় দেখিয়েই ভারত থেকে তাঁর নিজের সেবাদাসী রাজনীতির বিশাল মুজুরি দাবী করছে। দিল্লীর শাসকদের কাছে হাসিনার মূল দাবীটি হলোঃ বাংলাদেশে এবং সে সাথে সমগ্র পূর্ব-ভারতে তোমাদের স্বার্থ বাঁচাতে হলে, আমাকে বাঁচাও। বাংলাদেশের মাটিতে আওয়ামী লীগের যে বিকল্প নেই সেটিই ভারতীয় কানে বার বার ঢুকিয়ে দিচ্ছে। ভারত সে যুক্তি মেনে নিয়েই শেখ হাসিনার সরকারকে লাগাতর লাইফ সাপোর্টে রেখেছে। শেখ মুজিবকে যেভাবে তারা হারিয়েছে সেভাবে তারা হাসিনাকে হারাতে চায়। ভারতীয় লাইফ সাপোর্ট তুলে নিলে হাসিনা সরকারের যে ত্বরিৎ পতন ঘটবে -তা নিয়ে বহু বাংলাদেশীর সন্দেহ থাকলেও ভারতীয়দের নেই। হাসিনাকে বাঁচাতে তাই সেনা ছাউনীসহ বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ভারতীয় গোয়েন্দারা আস্তানা গেড়েছে। আগামী নির্বাচনে তাকে বিজয়ী করতে ভারত যে যথাসাধ্য চেষ্টা করবে তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? হাসিনার রাজনীতির মূল ভরসা তাই বাংলাদেশের জনগণ নয়, সেটি ভারত।

 

বাঙালী মুসলিমগণ ১৯০৬-৪৭য়ের রাজনীতিতে যে ভূমিকম্প এনেছিল তার পিছনে বাংলার ভূমি বা জলবায়ু ছিল না; সেটি ছিল ইসলামের প্যান-ইসলামিক চেতনা এবং উমমহাদেশে মুসলিম স্বার্থরক্ষার ভাবনা। সে চেতনার বলেই বাঙালী মুসলিমগণ অবাঙালীদেরও ভাই রূপে গ্রহণ করার সামর্থ্য অর্জন করেছিল এবং কায়েদে আযমকে নেতারূপে গ্রহণ করেছিল। ফলে সম্ভব হয়েছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। এক মুসলিম অন্য মুসলিমের ভাই ­তা যে অঞ্চল, যে ভাষা বা যে বর্ণেরই হোক না কেন। এ বিশেষ পরিচিতিটি মহান আল্লাহতায়ালার দেয়া, সেটি অমান্য হলে কি কেউ মুসলিম হতে পারে? এমন প্যান-ইসলামিক মুসলিম ভাতৃত্বের কারণেই আরব-কুর্দি, ইরানী-তুর্কী মুসলিমগণ জন্ম দিয়েছিল সবেচেয়ে শক্তিশালী বিশ্বশক্তির। সে ভাতৃত্বের কারণে আজও উর্দু, পাঞ্জাবী, সিন্ধি, পশতু ও বেলুচ ভাষাভাষী পাকিস্তানীরা জন্ম দিয়েছে ৫৭টি মুসলিম দেশের মাঝে সবচেয়ে শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্রের। অথচ এ পাকিস্তান ভেঙ্গে ৫টি বাংলাদেশের ন্যায় পৃথক পৃথক রাষ্ট্র সৃষ্টি হতে পারতো। মুসলিম জীবনে ঐক্য যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ -সেটি তো এভাবেই প্রমাণিত হয়।

 

তাই যে বাঙালী মুসলিমের অন্তরে সামান্য ঈমান আছে সে কি  প্রতিবেশী আসামী, রোহিঙ্গা ও ভারতীয় মুসলিমের বেদনা ভূলে থাকতে পারে? সেটি ভূললে কি ঈমান থাকে? তাই কোন আসামী, রোহিঙ্গা বা ভারতীয় মুসলিমের গায়ে গুলি লাগলে বাঙালী মুসলিম তার বেদনা যে হৃদয়ে অনুভব করবে -সেটিই তো স্বাভাবিক। অথচ হাসিনা ও তাঁর অনুসারিদের মাঝে সে বেদনা নাই। তাদের রাজনীতিতে মুসলিম ভাতৃত্বের সে ভাবনাও নাই। তাদের মূল ভাবনাটি হলো দলীয় স্বার্থ ও ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদারি। সে স্বার্থ বাঁচাতেই তাদের রাজনীতির মূল লক্ষ্য হলো, বাঙালী মুসলিম রাজনীতির মূল দুর্গে আঘাত হানা। তাই হামলার লক্ষ্য হলো ইসলাম ও ইসলামি চেতনা-সমৃদ্ধ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও বই-পুস্তক। তাদের কাছে নবীজী (সাঃ)র ইসলাম যাতে রয়েছে ইসলামী রাষ্ট্র, শরিয়ত, হুদুদ, প্যান-ইসলামিক ভাতৃত্ব ও জিহাদের ধারণা, গণ্য হয় সন্ত্রাস রূপে। ইসলাম বলতে তারা বুঝে দেওবন্দি, তাবলিগী, মাজভাণ্ডারী ও কবর-পূজার ইসলাম যাতে নাই ইসলামি রাষ্ট্র, শরিয়ত, হুদুদ ও জিহাদের ন্যায় পবিত্র কোরআনের মৌল আহকামগুলি প্রতিষ্ঠায় সামান্যতম আগ্রহ। এবং নবীজী সাঃ)র ইসলাম নির্মূল কল্পে তারা শুরু করেছে রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, মিডিয়া ও ধর্ম শিক্ষার অঙ্গণে ব্যাপক সোসাল ইঞ্জিনীয়ারিং। একাজে হাসিনাকে রশদ জোগাচ্ছে শুধু ভারত নয়, বরং বহু অমুসলিম সরকার।  তাবত ভারতীয় ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ যে ঘনিষ্ট পার্টনার -সেটি আজ আর গোপন বিষয় নয়। মহান আল্লাহতায়ার বিরুদ্ধে নেমেছিলেন শেখ মুজিব। তিনি কেড়ে নিয়েছিলেন ইসলামকে বিজয়ী করার সকল স্বাধিনতা। নিষিদ্ধ করেছিলেন সকল ইসলামী দল ও ইসলামী পত্র-পত্রিকা। অথচ কম্যুনিষ্ট পার্টিকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন মুসলিম ভূমিতে কম্যুনিজমের ন্যায় কুফরি মতবাদকে বিজয়ী করতে।

 

একই নীতি শেখ হাসিনার। তাঁর মন্ত্রী সভায় স্থান পেয়েছে চিহ্নিত ইসলামবিরোধীগণ।শেখ হাসিনা শুধু কোরআনের তাফসির, মসজিদে খোতবাদান, ইসলামি পুস্তক-প্রকাশ এবং মাদ্রাসার পাঠ্যসূচীর উপরই শুধু নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেননি, মাদ্রসাগুলিতে হিন্দু শিক্ষকদেরও নিয়োগ দিয়েছেন। সে সাথে ইসলামের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার বাড়তি নৃশংসতাটি হলো ইসলামপন্থিদের ফাঁসিতে ঝুলানোর নীতি। তবে ইসলামের বিরুদ্ধে এমন ষড়যন্ত্র নতুন নয়। ইংরেজদের হাতে অধিকৃত হওয়ার পূর্বে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ জমি লা-খেরাজ তথা খাজানা মুক্ত ছিল। সে জমি বরাদ্দ ছিল মাদ্রাসাগুলির জন্য। কিন্তু ইংরেজগণ সে ভূমি ছিনিয়ে নিয়ে হিন্দু জমিদারদের হাতে  তুলে দেয়; ফলে বিলুপ্ত হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি। এর ফলে বাংলার মুসলিমগণ দ্রুত নিরক্ষরে পরিণত হয়। কিন্তু সকল ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে ১৯৪৭ সালে তারাই প্রকাণ্ড রাজনৈতিক ভূমিকম্পের জন্ম দেয়। কারণ, ইংরেজদের জুলুম এবং হিন্দু জমিদারদের শোষণ আমূল বিপ্লব এনেছিল তাদের চেতনায়। ভূমিকম্পের জন্ম ভূমির গভীরে; আর রাজনৈতিক ভূমিকম্প জন্ম নেয় মনের গভীরে।

 

বাংলাদেশের জনগণের মনের গভীরে জমেছে প্রচণ্ড আগ্নেয় লাভা। এ লাভা ঘৃণার। দিন দিন তা বেড়ে উঠছে ভারত ও ভারতীয়পন্থি স্বৈরশাসকের নৃশংসতার বিরুদ্ধে তীব্র ক্রোধ নিয়ে। আগ্নেয়গিরির ন্যায় যখন তখন তা বিস্ফোরিত হতে পারে। হাসিনার নৃশংসতা থেকে বাঁচতে লক্ষ লক্ষ বাঙালীদেশী নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে পালিয়ে দিবারাত্র দৌড়ের উপর আছে। সে ঘৃণার আগুণে পেট্রোল ঢালছে ভারতীয় মুসলিমদের উপর হিন্দু সন্ত্রাসীদের বর্বরতা। গভীর ষড়যন্ত্র শুরু হচ্ছে আসাম থেকে ৪০ লাখ মুসলিমকে বাংলাদেশে প্রেরণ ও তাদের ভোটাধিকার, ঘরবাড়ি, জমিজমা, অর্থসম্পদ ও চাকুরি-বাকুরি ছিনিয়ে নিতে। নীল নকশার কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দ্রুত জমে উঠছে ভারতবিরোধী ঘৃণার লাভা শুধু আসাম থেকেই নয়, হিন্দুত্ববাদি সরকার সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে, পশ্চিম বাংলা থেকেও তারা অনুপ্রবেশকারি বাঙালী মুসলিমদের বাংলাদেশে তাড়িয়ে দিবে। তাদের দাবী, ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়ছে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশের কারণে। মুসলিম ভীতি  তাদেরকে এতটাই পাগলে পরিণত করেছে যে, প্রতিটি পূর্ব-ভারতীয় মুসলিমই তাদের কাছে বাংলাদেশী মনে হয়। স্রেফ গরুর গোশত ঘরে রাখার সন্দেহে সে দেশে মুসলিমদের পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। এরূপ জালেমদের সাথে বন্ধুত্ব করা তো গুরুতর অপরাধ। সে বন্ধুত্ব জালেমকে উৎসাহিত করে আরো নৃশংস হতে। সে অপরাধ দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় রাজনীতির অঙ্গণে ঘনিয়ে আসছে ভারত-বিরোধী ভূমিকম্প ভারতের এরূপ মুসলিম বিরোধী নীতিতে শেখ হাসিনা ও তাঁর দল নীরব থাকতে পারে; কিন্তু তাতে বাংলাদেশের জনগণও নীরব থাকবে? মোদীর পাশে দাঁড়ানোটি হাসিনার রাজনীতির বিষয় হতে পারে; কিন্তু বিপদে পড়া ভারতীয় মুসলিমদের পাশে দাঁড়ানোটি বাঙালী মুসলিমদের নূন্যতম ঈমানী বিষয়। সে দরদটুকু না থাকলে যে ঈমান থাকে না -সেটি হাসিনা না বুঝলেও নিরক্ষর বাঙালী মুসলিম ষোল আনা বুঝে। হাসিনার কাছে বাঙালীর ইতিহাসের শুরুটি ১৯৭১ থেকে। কিন্তু বাঙালী মুসলিমের গৌরবের ইতিহাসের সৃষ্টি তো ১৯০৪৭য়ে। ইতিহাস থেমে থাকে না। বস্তুতঃ ১৯৪৭য়ের বিজয়ের গৌরবই তাদেরকে আরেক বিজয়ে অনুপ্রাণীত করবে।

 

বাঙালী মুসলিম জীবনে এখন নিদারুন ক্রান্তিকাল। ভাগ্য নির্ণয়ের মুহুর্ত এখন বাঙালী মুসলিমের। এখন না দাঁড়ালে আগ্রাসী ভারত উঠে দাঁড়ানোর সামর্থ্যই বিলুপ্ত করে দিবে। দীর্ঘকাল খাঁচায় বন্দি রেখে খাঁচা খুলে দিলেও সিংহ বেড় হয় না। জনজীবনে একই অবস্থা নেমে স্বৈরশাসকের হাতে অধিকৃত হওয়ায়। তখন সমগ্র দেশ পরিণত হয় খাঁচায়। ভারত চায়, বাংলাদেশের জনগণ বেঁচে থাকুক খাঁচায় বন্দি সার্কাসের জীব রূপে। হাসিনা চায়, সে খাঁচার প্রহরী হতে। খাঁচার জীবনে মিছিল-মিটিং ও গণতন্ত্র থাকে না। প্রহরীর দায়িত্ব পেয়ে শেখ মুজিবও নিজেকে ধন্য মনে করতেন। তার হাতে ভারত ধরিয়ে দিয়েছিল ২৫ শালা দাসচুক্তির দলিল। যাদের মাথায় সামান্য ঘেলু আছে, তারা বিষয়টি বুঝে। এরূপ অবস্থায় আক্বলমন্দগণ দ্রুত কেবলা পাল্টায়। সময় থাকতে মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। ফলে দেখা দেয় দ্রুত রাজনৈতিক মেরুকরণ। সেনাবাহিনী ও পুলিশের যেসব লোকেরা ভারতমুখি হাসিনাকে নিরাপত্তা দিচ্ছে, তারা যে সহসাই মত পাল্টাবে -তাতেও কি সন্দেহ আছে? স্বৈরাচার নির্মূলকালে ইরান, মিশর, তিউনিসিয়া এবং লিবিয়াতে তো সেটিই ঘটেছে। এমন কি ১৯৭৫ সালে সেটি বাংলাদেশেও দেখা গেছে। কেবলা পরিবর্তনের সে হাওয়া ইতিমধ্যেই বইতে শুরু করেছে। যারা এক সময় কাদের মোল্লার ফাঁসি চাইতো তারাই এখন হাসিনার পতন চেয়ে ময়দানে নামছে। ঢাকার রাজপথের সাম্প্রতিক কিশোর বিদ্রোহ তো সেটিরই আলামত।

 

এমন দেশপ্রেমিক চেতনার কারণে বাংলাদেশের মাটিতে ভারতীয় স্বার্থের পাহারাদারির রাজনীতি যে জনগণের বিরুদ্ধে অপরাধ এবং দেশদ্রোহীতা গণ্য হবে তা নিয়ে কি সন্দেহ আছে? এরূপ অবস্থাতেই ক্ষোভে ও ঘৃণায় গণবিস্ফোরণ হয়। জনগণ অপরাধী ভারতীয়দের ধরতে না পারলেও তার কলাবোরেটরদের অবশ্যই হাতেনাতে ধরবে শাস্তিও দিবে একাজের জন্য বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, শিবির বা ছাত্রদল লাগবে না এক কালে যারা আওয়ামী লীগকে অন্ধভাবে সমর্থণ দিয়েছে -তারাই দ্রুত ময়দানে নেমে আসবে। নেমে আসবে অগণিত নির্দলীয় মানুষ। কারণ, বিষয়টি কোন দলের নয়, এটি সমগ্র দেশের। একাত্তরে পাকিস্তান বাঁচানোর প্রশ্নে বাঙালী মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি দেখা দিয়েছিল; সেটি বাংলাদেশ বাঁচানো নিয়ে দেখা দিবে না। কারণ, স্বাধীন বাংলাদেশ না বাঁচলে তাদের নিজেদের স্বাধীন ভাবে বাঁচাটিও ভয়ানক বিপদে পড়বে। সেটি বুঝার সামর্থ্য এমন কি স্কুল ছাত্রদেরও আছে। সাম্প্রতিক কিশোর বিদ্রোহটি ছিল মূলতঃ সে সমঝ-বুঝেরই প্রদর্শণী। ২৩/০৯/২০১৮ Tweet:@drfmkamal; facebook.com/firozkamal



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 
Last Updated on Friday, 28 September 2018 23:09
 
Dr Firoz Mahboob Kamal, Powered by Joomla!; Joomla templates by SG web hosting
Copyright © 2018 Dr Firoz Mahboob Kamal. All Rights Reserved.
Joomla! is Free Software released under the GNU/GPL License.